বন্ধ্যা জমিতে সবুজায়ন করে নজির অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর

Subscribe Us

বন্ধ্যা জমিতে সবুজায়ন করে নজির অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর

সোমনাথ মুখার্জি,লাউদোহা :- পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর ফরিদপুর ব্লকে প্রতাপপুর অঞ্চলের রুক্ষ, বন্ধ্যা জমিতে সবুজায়ন করে নজর কেড়েছেন ডিএসপি হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী অধীরেন্দ্র পাইন।  অধীরবাবু জানান জন্মসূত্রে তিনি মেদিনীপুরের লোক, তাই গাছের প্রতি ভালোবাসা ছোট থেকেই । 

তার পরিবারে রয়েছে তাঁর তিন ছেলে। কয়েক বছর আগে স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। চাকরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ঠিক করেন ,দুর্গাপুর ফরিদপুর ব্লকের প্রতাপপুর অঞ্চলের এক জায়গায় বাগান করবেন ।  ২০০৪ সালে পোতাপুরের একটা অঞ্চলে তিনি বাগান করার পরিকল্পনা নেন । 

সেই অঞ্চল ছিল একেবারে রুক্ষ বন্ধ্যা জমি। অধীরেন্দ্রবাবু জানান সেই সময় অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন যে এই জমিতে কী ভাবে সবুজায়ন হবে । তিনি বলেন  'জন্মসূত্রে আমরা মেদিনীপুরের লোক তাই গাছের প্রতি ভালোবাসা ছোট থেকেই এবং আমি বরাবরই সদর্থক চিন্তার  ব্যক্তি ।  তাই হবে না এরকমটা আমার মনে কখনোই ছিল না।' 

তাই কোনো কিছু না ভেবেই সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগেই শুরু করে দি প্রায় কুড়ি একর জায়গাজুড়ে  বাগান তৈরির কাজ । বাগান তৈরি করতে প্রথমেই যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সেটা 'জল '। আর সেই জলের সমস্যা মেটাতে বাগান এলাকা জুড়ে খনন করা হয় সাতটি পুকুর ।  

সেই পুকুর থেকে জল সংগ্রহ করে শুরু হয় বাগান তৈরির কাজ । ইতিমধ্যেই তাঁর বাগানে ঘুরে গেছেন খড়গপুর আইআইটি বিজ্ঞানীরা, বোলপুর থেকে ফরেস্টের বড় বড় আধিকারিকরা এছাড়াও হর্টিকালচার ডিপার্টমেন্টের উচ্চ পদস্থ আধিকারিক । 

অধীরেন্দ্র বাবু জানান,আমরা বর্তমান সময়ে প্রায় সকলেই নানান ধরনের সার ইউরিয়া যুত্ত শাকসবজি ফলমূল খেয়ে অসুস্থ হচ্ছি । তাই আমার মনে হয় এটাই বাসা বেঁধেছিল যে আমি যে বাগান করব সেটা হবে সম্পূর্ণ অর্গ্যানিক পদ্ধতিতে । 

আজ এই বাগানের সমস্ত ফসল সবই অর্গানিক পদ্ধতিতে তৈরি। তিনি জানান যদিও এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে অর্গানিক বাগানের সার্টিফিকেট আমরা পাইনি সে পেলেই আমরা বলতে পারব আমরা  সম্পূর্ণ অর্গানিক বিষমুক্ত ফল ,শাকসবজি মানুষকে  দিচ্ছি । 

তিনি জানান তার বাগানে রয়েছে প্রায় ৭০ প্রজাতির আমগাছ । তার সাথে সাথে ৮ প্রজাতির পেয়ারা , কয়েক প্রজাতির লিচু এ ছাড়াও এখানে গাছের চারাও তৈরি করা হয় যেগুলো কমার্শিয়ালি বিভিন্ন নার্সারিতে পাঠানো হয়। 

অধিরেন্দ্র বাবুর মেজো ছেলে অচিন্ত পাইন এমসিএ করার পর নরওয়েতে আইটি সেক্টরের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাবার সঙ্গে বাগান তৈরির কাজে হাত লাগান । অচিন্ত বাবু জানান ,বাগান তৈরির সময় অনেক প্রতিকূলতা সামনে এসেছে এই এলাকার মানুষ বুঝত না বাগানের গুরুত্ব । কিন্তু ধীরে ধীরে এলাকার মানুষ বুঝতে শেখে এবং পরে সহায়তাও করে । 

সব মিলিয়ে বাগানে প্রায় চৌদ্দ জন কর্মী কাজ করেন বেশির ভাগ স্থানীয় । এককথায় বাগান তৈরির ফলে স্থানীয় কিছু লোকের কর্মসংস্থানও হয়েছে । তিনি জানান তার এই কাজের জন্য ২০১৫ রাজ্য সরকারের তরফে কৃষক সম্মান পান । পরের বছর ২০১৬ সালে কৃতি কৃষক পুরস্কার পান । 

এ ছাড়াও ভারত সরকারের তরফে  তিনি  জার্মানি যান তিনি। সেখানকার অভিজ্ঞতা বিষয়ে তিনি জানান 'জার্মানিতে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কীভাবে আমাদের এই এলাকায় চাষ হয় । এবং সেখান থেকেই নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আজ এখানে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে এই সুন্দর বাগান তৈরি হয়েছে বর্তমানে। তিনি জানান শুধু মুনাফা নয় আর সেই কারণেই তাঁর বাগানের প্রায় সমস্ত ফসল এলাকার মানুষদেরই বিক্রি করেন তিনি ।

প্রতাপপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান সঞ্জয় মুখার্জি এ বিষয়ে বলেন ,মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবুজায়নের বার্তা দিয়েছেন। সেই সবুজায়নের অনেকটাই করছেন এই অধীরেন্দ্র  বাবু ও তাঁর সন্তানেরা। আর তাদের এই কাজে প্রতাপপুর পঞ্চায়েত তথা দুর্গাপুর ফরিদপুর ব্লক সব সময় তাদের হাতে আছে। বাগানের জলের সমস্যার সমাধান খুব শিগগিরই হবে বলে আশ্বাস দেন সঞ্জয়বাবু।

এক কথায় এমন সবুজায়ন সুন্দর নানান ফলের ফুলের বাগান পশ্চিম বর্ধমানে নজির সৃষ্টি করেছে । আর এই বাগান দেখেই এলাকার কৃষিজীবী অনেক মানুষ বাগান তৈরিতে উদ্যোগী হবে বলে আশা করেন এই অর্গানিক বাগানের সৃষ্টিকর্তা অধীরেন্দ্র পাইন ।

Post a Comment

0 Comments