Subscribe Us

তোপের ধোনির শব্দের সাক্ষী থাকতে,আজও শহর ছেড়ে দুর্গা পুজোর সময় হাজার হাজার ভক্ত ভিড় জমান এখানে প্রতি বছর


তনুশ্রী চৌধুরী,কাঁকসা:- বাংলার সবার প্রথম কোথায় দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিলো তা হয়তো অনেকের জানা নেই। পুরানো ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় যখন বাংলা দেশ ও ভারত একটি দেশ ছিলো সেই সময় দেশ শাসন করতেন বক্তিয়ার খলজি । সময় টা ছিলো প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি আগে। বাংলায় ছিলেন লক্ষণ সেন । বক্তিয়ার খলজি বার বার লক্ষণ সেনের উপর হামলা করতেন বলে লক্ষণ সেন তার সৈন্য নিয়ে লুকিয়ে পড়েন কাঁকসার গড় জঙ্গলে। 

এই জঙ্গল এতটাই বড়ো এবং ঘন যে সহজে কেউ লুকিয়ে পড়লে খুঁজে পাওয়া যেতনা । আর এই গড় জঙ্গলেই ছিলো কপালিক দের বাস। এই কোপালিকরাই শুরু করেছিলেন দুর্গাপুজো। তবে দেবীর কোনো মূর্তি ছিলো না বদলে একটি পাথরে খোদাই করা দেবী মূর্তি ছিলো তাকেই পুজো করতেন তারা। পুজোর সময় কপালিকরা নরবলি দিতেন । 

যে বছর লক্ষণ সেন এই গড় জঙ্গলে আত্মগোপন করেন সেই বছর কপালিকরা সিদ্ধি লাভের জন্য ১০৮ টি নরবলি দেবে বলে স্থির করেন। এদিকে লক্ষণ সেন নরবলি তে বাধা দেবে জানতে পেরে । কপালিকরা লক্ষণ সেনের শরণাপন্ন  হয়ে তাকে উলটে বলা হয় যে রাজা লক্ষণ সেন যদি পুনরায় শক্তি বৃদ্ধি করতে চান তাহলে তাকে এই পুজোতে থেকে দেবীকে প্রসন্ন করলে তিনি আবার পুনরায় শক্তি ফিরে পাবেন।

রাজা লক্ষণ সেন রাজি হলেও মাঝে এসে ব্যাঘাত ঘটান তার সভাকবি কবি জয়দেব। তিনি বলেন দেবীর জাগ্রত হবার প্রমান দিতে ,তবে বলি হবে নচেৎ বন্ধ করতে হবে।কপালিকরা তা দেখাতে না পারায় কবি জয়দেব নিজেই দেবীর দুর্গা এবং কৃষ্ণের রূপ ধারণ করে। বলি প্রথা বন্ধ করে দেন। তবে কপালিকরা কতদিন আগে পুজো শুরু করেছিলেন তা কারো জানা নেই। 

তবে কবি জয়দেব দেবীর দুই রূপ দেখানোর পর থেকেই দেবীর নাম হয় শ্যমরূপা। সেই থেকেই লক্ষণ সেন পুনরায় পুজোর সূচনা করেন। তবে আসল মূর্তি বন্যায় ভেসে যাওয়ায় পরে অনুকরণ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেই চলতো পুজো। শোনা যায় লক্ষণ সেন মারা যাবার আগে গড় জঙ্গলের ও পুজোর দায়িত্ব দিয়ে যান ইছাই ঘোষ কে। পরে ইছাই ঘোষের সাথে লাউ সেন ও কর্ণ সেনের যুদ্ধ লাগলে যুদ্ধে পরাজিত জয়ে মারা যান ইছাই ঘোষ। 

ইছাই ঘোষের পালিত কন্যার বিবাহ হয়েছিল কাশিপুর মহারাজের ছেলের সাথে । ইছাই ঘোষ মারা গেলে তার পালিত কন্যা দেবী মূর্তি নিয়ে যাবার চেষ্টা করলে বরাকরের কাছে নদীতে পরে যায়। অনেক খোঁজার পরেও তা পাওয়া যায় নি। অগত্যা তারা কাশিপুরেই ফিরে যান। পরে সপ্নাদেশ পান দেবী ওখানেই আছে তাকে ওই জায়গাতেই প্রতিষ্টা করার নির্দেশ দেন। সেই মতো কল্যানিশ্বরীতেই তাকে মন্দির করে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। 

তাই আজও শ্যামরুপার পুজো শুরু হবার পর কল্যানিশ্বরীতে পুজো শুরু হয়। নরবলি না হলেও আজও এখানে ছাগ বলি প্রথা চলে আসছে। এছাড়া সারা বছরই নিত্য সেবা হয় এখানে। বিশেষ করে পুজোর কয়েকটা দিন এখানে নরনারায়ন সেবার আয়োজন থাকে পুজোর কয়েকটা দিন। ঘন জঙ্গলের ভিতরে যাতে মানুষের যাতায়াতে কোনো সমস্যা না হয় তার জন্য গোটা জঙ্গল নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে দেয় কাঁকসা থানার পুলিশ। 

এখানে পুজোর আরও একটি আকর্ষণ হলো অষ্টমীর দিন তোপের ধোনি শুনতে পাওয়া যায় । তার পরেই শুরু হয় বলি প্রথা। শুধু শ্যামরূপা নয়। তোপের ধোনি শুনে বলি হয় জঙ্গলের আসে পাশের সমস্ত গ্রামে। আর এই তোপের ধোনি শোনার জন্য জেলা রাজ্য ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্য প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেন এখানে। 

আরো পড়ুন :- আজও স্বমহিমায় বিরাজমান উখরার ভট্টাচার্য বাড়ির ক্ষ্যাপা দুর্গা 

এখানে গাছের গায়ে ইটের টুকরো বেঁধে হয় মানষিক । আর মানষিক পূরণ হলে দেবীকে মানশীকের মতো ফল মিষ্টি দিয়ে পুজো দেন ভক্তরা।

তবে ভক্তদের আক্ষেপ যে ভাবে শব্দ দূষণ হয় তাতে আর কোনটা বাজির আওয়াজ আর কোনটা তোপের ধোনি তা বুজে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে জঙ্গলের ভিতরেই কোথা থেকে তোপের ধোনি হয় যা আজও অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি কারোর।

শহরের পুজো ছেড়ে ঘন জঙ্গলের ভিতর গা ছমছম করা পরিবেশে এসে বাংলার প্রথম শুরু হওয়া পুজো দেখতে ও তোপের ধোনির শব্দের সাক্ষী থাকতে,আজও শহর ছেড়ে আজ হাজার হাজার ভক্ত ভিড় জমান এখানে প্রতি বছর।

Post a Comment

0 Comments